নতুন পাকিস্তান দুঃখ প্রকাশ করবেই – হামিদ মীর
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক জাকি জনপ্রিয় একটি আরব টিভি চ্যানেলে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে গণহত্যার জন্য বাংলাদেশি ভাইদের কাছে সম্প্রতি পাকিস্তানের সাংবাদিক ও আইনজীবীরা ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টির প্রশংসা করেন তিনি। জাকি দাবি করেছেন, একইভাবে ফিলিস্তিনিদের কাছেও পাকিস্তানিদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। কারণ, ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যার জন্য পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা দায়ী।
আমি জাকিকে বলেছিলাম, বাংলাদেশে ৩০ লাখের বেশি মানুষের হত্যার জন্য পাকিস্তানি গণমাধ্যম বা আইনজীবীরা দায়ী নয়। কিছু জেনারেল এই অপরাধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। চুড়ান্ত অবস্থায় পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছিল। আমরা পাকিস্তানিরা আসলে চাইছি, আমাদের সেনাবাহিনী বাংলাদেশিদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করুক। আমরা বেশ কয়েক মাস ধরে এই দুঃখ প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু আমরা যখন বুঝলাম, এতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, তখন আমরা পাকিস্তানের বেসামরিক মানুষের পক্ষে বাংলাদেশিদের কাছে দুঃখ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ঘটনাটি সম্পুর্ণ ভিন্ন।
ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক (পরে যিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন) ১৯৭০ সালে জর্ডানি সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ডিভিশনের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি আম্মানে মার্কিন সেনাবাহিনীর সমর্থনে ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন। এই মুক্তিযোদ্ধারা সুইস বিমান ও প্যান অ্যাম বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁরা জর্ডানের বাদশা হোসেন হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন বাদশা পাকিস্তানের কাছে সহায়তা চান। বাদশার অনুরোধে পাকিস্তান সরকার ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার এই সামরিক কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিল জর্ডানে। সেই কর্মকর্তাই হচ্ছেন জিয়াউল হক। এই কর্মকর্তা জর্ডান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন।
জাকি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি যুক্তি দেখাতে লাগলেন, জেনারেল ইয়াহিয়া খানই ১৯৭০ সালে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জিয়াকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবার এই ইয়াহিয়া হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি ১৯৭১ সালে জেনারেল টিਆা খান ও জেনারেল নিয়াজীকে বাংলাদেশিদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। জাকি বলেন, ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে যে অপরাধ করেছিলেন, সে জন্য যদি আপনারা দুঃখ প্রকাশ করতে পারেন তাহলে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে সেই ইয়াহিয়ার একই ধরনের অপরাধের জন্য কেন আপনারা দুঃখ প্রকাশ করতে পারেন না? নিশ্চয় জাকির কথার যুক্তি আছে। শেষ পর্যন্ত আমি অবশ্য ওই অপরাধের জন্য তাঁর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি, যে অপরাধ আমি ব্যক্তিগতভাবে করিনি। তবে আমার লজ্জা হচ্ছিল এই ভেবে যে জিয়া হচ্ছেন একজন পাকিস্তানি, যিনি কি না ফিলিস্তিনিদের হত্যা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিরুদ্ধে আমার অবস্থানের কারণে ইতিমধ্যে পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরাগভাজন হয়েছি আমি। কিন্তু এ নিয়ে আমার কোনো অনুতাপ নেই। পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ আমাদের এই দুঃখ প্রকাশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে।
সন্দেহ নেই, ২০০৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর আধুনিক পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। এই দিন ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্নদিন। পাকিস্তানের সাংবাদিক, লেখক, কবি, আইনজীবী, ছাত্র ও সুশীল সমাজের মানুষ ইসলামাবাদ প্রেসক্লাবের সামনে ফুটপাতে মোশাররফ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে কায়েদে আযমের জন্নদিন উদযাপন করেছেন। আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনেক নেতা ওই দিন একই ফুটপাতে বড়দিন পালন করেন। ইতিহাসে এই প্রথম জিন্নাহর জন্নদিন পাকিস্তানের রাজধানীর ফুটপাতে পালিত হলো। অনেক বক্তা বলেছেন, পাকিস্তান এখন ১৯৭১ সালের মতো ভয়াবহ এক পরিস্িথতি পার করছে। সাবেক আমলা রোয়েদাদ খান বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকায় তথ্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন যেসব বাঙালি পাকিস্তানি কেবল আইনের শাসনের দাবি করেছিল, তাদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে সে দৃশ্য তিনি নিজেন চোখে দেখেছেন। সেনাবাহিনীর সহিংসতা পরিস্িথতিকে আরও নাজুক করে তুলেছিল। তাদের কারণে পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছে। রোয়েদাদ খান বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবার ইসলামাবাদ থেকে বেলুচিস্তান পর্যন্ত নিজের জনগণকে হত্যা করছে। কিন্তু তাদের এই সহিংসতা আরও বেশি সহিংসতার জন্ন দেবে।
রোয়েদাদ খানের বক্তৃতার পর সমাবেশে উপস্িথত জনগণের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বক্তৃতায় আমি একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করি যে, ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য সাধারণ পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে আজ অবশ্যই আমাদের বাংলাদেশি ভাই-বোনদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের অবশ্যই দাবি জানাতে হবে, পাকিস্তানি সরকারকেও ‘আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ’ প্রকাশ করতে হবে। অপ্রত্যাশিতভাবে উপস্িথত অগুনতি মানুষ আমার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে বেশ কিছু ছাত্র ব্যানার তৈরি করে ফেলে, যাতে কালো মার্কার কলম দিয়ে লেখা ছিল, ‘প্রিয় বাংলাদেশিরা, একাত্তরের গণহত্যার জন্য আমরা দুঃখিত’। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যানারটি সমাবেশের মঞ্চে আনা হয়। আর এই ব্যানার আমাদের সমাবেশের চারপাশে মোতায়েন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মর্মাহত করে। তবে তাঁরা নীরবই ছিলেন। পরে সন্ধ্যার দিকে আমরা যখন সমাবেশস্থল ত্যাগ করছিলাম, তখন একজন বয়স্ক ব্যক্তি আমাদের থামালেন। তিনি জাতিতে পাঠান। আমাকে বললেন, ‘ব্যাটা, ৩৬ বছর পর তুমি বাংলাদেশিদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছ। কিন্তু ২০০৭ সালের জুলাইয়ে লাল মসজিদে গণহত্যার জন্য কে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা করবে?’
আসলে গত বছর লাল মসজিদে গণহত্যার পর ১৯৭১ সালে তাদের বাংলাদেশি ভাইদের কপালে কী ঘটেছিল, অধিকাংশ পাকিস্তানি বোধহয় তা বুঝতে পেরেছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে যখন সাতটি মসজিদ ভেঙে ফেলে, তখন থেকেই লাল মসজিদ সংকটের শুরু। লাল মসজিদের খতিব এসব মসজিদ ভাঙার বিরোধিতা করেছিলেন এবং মসজিদের পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসার ছাত্রীরা প্রতিবাদস্বরূপ কাছের একটি ভবন দখল করে। তারা ভেঙে ফেলা মসজিদ পুনর্নির্মাণের দাবি জানায়। এই সংকট ছয় মাস ধরে চলতে থাকে। সব শেষে জেনারেল মোশাররফ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’য়ের নামে ছোট ছোট ছাত্রীকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার সিদ্ধান্ত নেন। লাল মসজিদকে পাকিস্তানে আল-কায়েদার ঘাঁটি বলে ঘোষণা দেন তিনি। লাল মসজিদে প্রথমে রকেট হামলা চালানো হয়, তারপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা মসজিদ ভবনে ঢোকে। মসজিদের ভেতরে কয়েক শ ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে গণহত্যার নমুনা ধ্বংস করে ফেলতে তাদের মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। দগ্ধ মৃতদেহগুলোর স্থান হয় শহরের বাইরে গণকবরে। শত শত ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক এখনো নিখোঁজ। সুপ্রিম কোর্ট এই গণহত্যার ঘটনাটি আমলে নেন এবং এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেন। আর এ কারণে ২০০৭ সালের ৩ নভেম্বর মোশাররফ প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করেন।
বিচারপতি ইফতিখার সেইসব গোয়েন্দা সংস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিলেন, যারা ২০০৬ সালে বেলুচ বিদ্রোহীদের এবং ২০০৫ সালে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতীয় এলাকায় গণহত্যার জন্য দায়ী। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, পশতু উপজাতীয় এলাকায় সরকার গণহত্যা চালানোর কারণে পাকিস্তানে সম্প্রতি আত্মঘাতী বোমা হামলা বেড়ে গেছে। প্রথম সিআইএ এবং পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই পশতু উপজাতির লোকজনকে রাশিয়ার (পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। আর এখন সেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকেরাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের হত্যা করছে। পাকিস্তানে জেনারেলদের এসব কাজে সব সময় সমর্থন দিয়েছে সিআইএ। কারণ, এই জেনারেলরা যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতে নিজের লোকদের হত্যা করতেও প্রস্তুত। এমনকি তাঁরা পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে হত্যা করেছে। পরে এই জেনারেলরাই নোংরা রাজনীতিকে রূপান্তরিত হন। এরাই নিজের দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
আল্লাহকে ধন্যবাদ, এখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কিছু কিছু শিখতে শুরু করেছে। নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি নির্দেশ জারি করেছেন যে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দুরে থাকতে হবে। এমনকি মোশাররফপন্থী পাকিস্তান মুসলিম লিগ-কায়েদে আযমকে (পিএমএল-কিউ) সহযোগিতা করতে মোটেই আগ্রহী নন তিনি। ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করতে আগ্রহ নেই তাঁর। জেনারেল কায়ানি নিশ্চিত, সত্যিকারের গণতন্ত্রই কেবল দেশকে বাঁচাতে পারে। নতুন সরকার অস্ত্র বা বোমা দিয়ে নয়, সংলাপের মাধ্যমে পশতু উপজাতীয় এলাকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে। সেনাবাহিনী যদি রাজনীতি থেকে দুরে থাকে, তাহলে পাকিস্তান আরেকটি ইরাক হবে না। সিআইএ এখন চাচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে হত্যার নামে সেনাবাহিনী আরও পশতুকে হত্যা করুক। কিন্তু প্রয়াত নেত্রীর দল ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। পিপিপি সিআইএর দাবি মেনে নিতে রাজি নয়। দলের নেতারা মানতে রাজি নন যে, আল-কায়েদার প্রতি সহানুভুতিশীল পশতুরা বেনজিরকে হত্যা করেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তাঁরা নতুন করে তদন্ত শুরু করতে চান। কারণ, ওই দিনটি পাকিস্তানকে বদলে দিতে পারে। এই দেশ মোশাররফকে ছাড়াও টিকতে পারবে। কারণ, এ পৃথিবীতে কেউই অপরিহার্য নয়। ১৮ ফেব্রুয়ারির পর নতুন পাকিস্তান হবে। একদিন আমাদের সরকার শুধু বাংলাদেশিদের কাছেই নয়, ফিলিস্তিনিদের কাছেও আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করবে।
ইংরেজি থেকে অনুদিত।
হামিদ মীর: নির্বাহী সম্পাদক, জিয়ো টেলিভিশন, পাকিস্তান।